বাংলা ব্লগ দিবসের অনুষ্ঠান থেকে ফিরে : যে যুদ্ধ লড়ে যাই আমরা সবাই


বিলিয়া সেন্টারের সামনের উঠোনটা, তার একতলা হলঘরকে ছায়া দেয়া সবুজ গম্ভীর গাছটা, সামনের ঝিম ধরানো ধানমন্ডির ফাঁকা ফাঁকা রাস্তাটা, সব কিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে যখন ভেতরে গিয়ে বসলাম, তখন অনুষ্ঠান শুরুর আর দেরী নেই মোটেও। ব্লগারদের ব্যস্ত ছুটোছুটি, দল বেঁধে কেউ বা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে, কেউ বা দূরে দাঁড়িয়ে মগ্ন নিজস্ব আড্ডায়; এসব কিছু মিলে মিশে এক আন্তরিক প্রশান্তির পরিবেশ।

আজকে এখানে বাংলা ব্লগ দিবসের উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অনলাইন এক্টিভিজমের নতুন এক ধাপ। জন্মের জানান দিচ্ছে আমারব্লগ রিসার্চ ফাউন্ডেশন, মোড়ক উন্মোচিত হচ্ছে দুইটি বইয়ের, আর মাঠের মানুষের সঙ্গে নেটের মানুষদের যোগসূত্র তৈরী হচ্ছে এই বিকেলে। দিনটি তাই অন্যরকম মনে হয় কিছুটা।

আলোচনা শুরু হয় যখন অমি রহমান পিয়াল বর্ণনা করেন রাতের পর রাতের সেই সাইবার যুদ্ধের কথা, যেখানে একদিকে একাত্তরের পরাজিত শক্তির শ্বাপদছানারা, অন্যদিকে অসংখ্য অগুনতি ব্লগার। জানান, সেই যুদ্ধেরই পরিণত এক রূপ আমারব্লগ রিসার্চ ফাউন্ডেশন। উদ্দেশ্য তার সুস্পষ্ট, লক্ষ্যভেদী।

তোমাদের হাতে আমাদের মশাল,উঁচু রাখো প্রিয় তরুণরা : বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয় নাগরিক কমিশন এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী। এই বৃদ্ধ বয়েসেও তিনি নিরন্তর সক্রিয়, তার তরুণ মন তাই আমাদের ঈর্ষার বস্তু। সাইবার এক্টিভিজম সম্পর্কেও এই প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বের ধারনা অনেক।
তিনি বাংলা ব্লগ দিবসে আমারব্লগের এই আলোচনা অনুষ্ঠানটিকে দেখছেন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে। আবেগাপ্লুত হয়ে
তিনি বললেন, তোমাদের মাঝে এসে আমার মনে হচ্ছে আরো যদি দশটা বছর বেশি বাঁচি, তাহলে এই বিচার আমি দেখে যেতে পারব । তোমাদের শানিত চোখ, ইস্পাত কঠিন শপথ আর এই গুছিয়ে তোলা আয়োজন দেখে আমার বিশ্বাস, যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি হবে না । আমরা আমাদের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য এই প্রজন্মের তরুণদের উপর ভরসা রাখতে পারি, তারা কখনোই বিফল হবে না।

নিউ মিডিয়া আর তথ্যঅস্ত্র : শাহরিয়ার কবিরের দিকনির্দেশনা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-ঢাকা সহায়ক মঞ্চের আহ্বায়ক লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির শুরু করলেন সাম্প্রতিক মিশর পরিস্থিতি নিয়ে। সেখানে কোনো নেতা নেই, সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি সামনে নেই, তবু অগুনতি মানুষ প্রাণ দিচ্ছে অকাতরে, লড়ছে গণতন্ত্রের লড়াই। বিশ্ব মিডিয়া এই রাজনীতির নেতাদের নাম দিচ্ছে ফেসবুক জেনারেশন। ফেসবুক, ব্লগ আর টুইটারের নেটওয়ার্কে মিশরের এই গনতন্ত্রের সংগ্রাম একান্তই নেটিজেনদের হাতে প্রাণ পাওয়া।

শাহরিয়ার কবির এর মাঝেই গুরুত্ব খুঁজে নিলেন আগামী দিনের এই নতুন মিডিয়ার। জানালেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য ছিল যে একাত্তরের পরাজিত শক্তি অনলাইন মিডিয়া নিয়ন্ত্রনে কিভাবে বড় ফান্ড নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন রুখে দিয়েছেন এই প্রজন্মের ব্লগাররাই। কিন্তু অনলাইনে এই প্রজন্মেরই বিভ্রান্ত তরুণদের একটি বড় অংশ পাকিস্তানী চেতনার ধারক ও বাহক দেখে তিনি শংকিত। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির

শাহরিয়ার কবির গুরুত্ব দিলেন নিজেদের সংগঠিত করার, শানিত করার। তিনি প্রোপাগান্ডার জবাবে প্রতিক্রিয়া নয়, তথ্য ছুড়ে দেওয়ার জন্য বেশি জোর দিলেন। শাহরিয়ার কবির সন্ধান দিলেন দেশের কোথায় কোথায় মুক্তিযুদ্ধ এবং রাষ্ট্রচিন্তার বড় বড় সব সংগ্রহ ছড়িয়ে আছে, সেগুলোকে অনলাইনে উন্মুক্ত করে দেয়ার জন্য তিনি আমারব্লগের সহায়তা কামনা করলেন।

শাহরিয়ার কবির দেখছেন আমারব্লগ রিসার্চ ফাউণ্ডেশনের এই যাত্রাটিকে একান্তই অনলাইন এক্টিভিজমের অতি প্রয়োজনীয় ধাপ হিসেবে। প্রাতিষ্ঠানিকতা দিয়ে ব্লগিংকে গুছিয়ে তোলার এখনই সময় বলে মনে করেন তিনি, তাই ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনে বাংলা ব্লগ দিবসকে পালন তার কাছে তরুণ প্রজন্মের সাইবারস্পেস যাত্রার একটি মাইলফলক মনে হয়েছে তার কাছে । তার কাছে বাংলা ব্লগ দিবসে এই আয়োজনটি ঐতিহাসিক, যেখানে মাঠের লড়াই আর অনলাইন লড়াইয়ের লড়িয়েরা একসঙ্গে কথা বলতে পারছেন, আইডিয়া শেয়ার করতে পারছেন।

তিনি মনে করেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শুধু স্লোগান তুললেই শেষ হবে না, বাংলা ব্লগারদের উচিত বিশ্বের এ সংক্রান্ত বিচারকাজগুলোকে খুটিয়ে বিচার করা, সেগুলোকে সামনে নিয়ে আসা এবং শুধু নেটে নয়, এই তথ্যগুলোকে সম্মিলিত করে ট্রাইবুনাল, মিডিয়া, সরকার, সুশীল সমাজ; সবাইকে সহায়তা করা। এই কাজে ব্লগাররা আরো মনোযোগী হবেন, এমনটাই আশা করেন তিনি।

আশাবাদী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর চোখে অনলাইন এক্টিভিজম নতুন প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধেরই একটি অংশ। তার চোখে এই সাইবার এক্টিভিজম জরুরি, কারন আগামী প্রজন্মের কাছে এই মিডিয়াটি খুব জনপ্রিয়। তাই এখানে প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ অগুনতি মানুষ, যারা দেশকে ভালোবেসে দেশের জন্য নিজেদের ভাবনগুলোকে ছড়িয়ে দেবে সবখানে। সাম্প্রতিক মেহেরজান সিনেমা আর সেই সিনেমার প্রতি ঘৃণা ছুড়ে দিতে বাংলা ব্লগারদের যৌথ প্রচেষ্টাটি যে একটি বড় সাফল্য, সেকথাও বলতে ভুলেননি এই মুক্তিযোদ্ধা নারী।

বাংলা ব্লগ দিবসের প্রাক্কালে তাই আমারব্লগের নতুন সব উদ্যোগ তার কাছে অনেক অনুপ্রেরণার, অনেক আশা জাগানিয়া। তিনি সেই আশাগুলো বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশ্বাস রাখেন বাংলা ব্লগারদের কাছে।

যুদ্ধাপরাধীকে হত্যা নয়, ধ্বংস করতে হবে চেতনা:এমনটাই ফরিদা মজিদের ভাষ্য

ফরিদা মজিদ নিজেও সাইবার এক্টিভিজমের সঙ্গে জড়িত। প্রবাসী এই গবেষক প্রতিনিয়ত লড়ে চলেন পাকিপ্রেমীদের বিরুদ্ধে, সোচ্চার থাকেন অনেকগুলো ইংরেজি ফোরামে। ফরিদা মজিদের চিন্তায় তাই যুদ্ধাপরাধকে খন্ডিত করে দেখার অবকাশ নেই। তিনি ব্লগারদের অনুরোধ করলেন, ব্যক্তি যুদ্ধাপরাধী নয়, বরং যুদ্ধাপরাধ এবং পাকিস্তান নামের চেতনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বকীয় চেতনাকে ভাস্বর করে তুলতে। তিনি মনে করেন নতুন প্রজন্মের বড় দায় হচ্ছে আমাদের শেকড়কে চিনে নেয়া, সেই শেকড়ের কথা বলা। তাহলেই আগাছাগুলো ঝরে যাবে একসময়, তার জন্য আলাদা কষ্ট করতে হবে না।

-
কথা হয় অনেক, কথার পিঠে চলে কথা। অনুষ্ঠান শেষে চা চক্রে ব্লগাররা ঘিরে ধরেন এই ব্যক্তিত্বদের। চলে অনেক মত বিনিময়। নতুন প্রজন্মের ভাবনাগুলো যেভাবে সংক্রামিত হয় তাঁদের মাঝে, তেমনি তাঁদের কাছ থেকেও অনেক অজানা কথা জানতে পারেন এই প্রজন্মের ব্লগাররা।
একসময় রাত ঘনায়।

বিদায় বেলায় এক তরুণের পিঠে হাত রেখে বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী আবার বলেন, ‘ জানি, তোমরা পারবে, তোমরাই পারবে।’

এই আশাবাদের কথা অনূরিত হয় চারপাশে।
আমি আমার পাশে একদল দৃপ্ত শপথে তেজিয়ান নেটিজেনদের দেখি।
বাংলা ব্লগের ইতিহাসে এই দিনগুলো আলোচিত হবে কোনো এক যুগে, আজকের দিনে আমি সেই বিশ্বাসই রাখি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s